ড.হাবিবুর রহমান, শিল্পপতি ইয়াহিয়া, চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন ও হামিদ চেয়ারম্যান দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করায় পাল্টে গেছে ভোটের চিত্র
জসিম উদ্দিন টিপু, টেকনাফ:
প্রচার-প্রচারণা শেষ। শেষ প্রচারণার অংশ হিসেবে গতকাল (সোমবার) নিজ নিজ উপজেলায় ধানের শীষ এবং দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে পৃথক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উখিয়াতে ধানের শীষের সমর্থনে অনুষ্ঠিত জনসভা জনসমুদ্রে রুপ নেয়। অপরদিকে টেকনাফ হাইস্কুল মাঠে অনুষ্টিত দাঁড়িপাল্লার শেষ জনসভা লোকে লোকরণ্যে পরিণত হয়। সমাবেশ দুটিতে তিল ধরণের কোন ঠাঁই ছিলোনা। জনসভা দুটিতে নারীদের অংশ গ্রহণও চোখে পড়ার মতো ছিল।
শেষ জনসভায় উপস্থিত জনতার সামনে ধানের শীষের প্রার্থী আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী বিভিন্ন ধরণের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। ১২ফেব্রুয়ারী জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে তিনি প্রতিশ্রুত উন্নয়ন কর্মকান্ডে পর্যায়ক্রমে হাত দিবেন বলে জানিয়েছেন। অপরদিকে ১১দল সমর্থিত দাঁড়িপাল্লার মার্কার প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী টেকনাফ হাইস্কুল মাঠ ভর্তি হাজার হাজার জনতার সামনে তাঁর ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। নির্বাচিত হলে তিনি সকলকে সাথে নিয়ে আধুনিক উখিয়া-টেকনাফ গঠনে পরামর্শের ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
ভোটারদের সাথে আলাপ আলোচনায় দেখা গেছে, গত সপ্তাহ পর্যন্ত ভোটের মাঠে ধান ও দাঁড়িপাল্লা সমানে সমান অবস্থানে ছিলো। সে সময়েই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ধারণ করেছিল ভোটাররা। ওই সময় ভোটারদের মুখে মুখে আলাপ করতে শুনা যায় যে,ধান এবং দাঁড়িপাল্লা কেউ কাউকে ছাড় দিবেনা। আনোয়ারী ও শাহজাহান চৌধুরীর মধ্যে কড়াকড়ি লড়াই হবে বলে ধারণা করেছিল ভোটার সংশ্লিষ্টরা। জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী একজন প্রবীণ ঝানু নেতা। এর আগে তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন উখিয়া-টেকনাফ আসন থেকে। অভিজ্ঞ প্রবীণ এই নেতা অত্যন্ত স্বজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে খ্যাতি রয়েছে। ব্যাক্তিগত ইমেজ এবং বড় দলের জেলার কান্ডারী হিসেবে ধানের শীষের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী একজন পরোপকারী মানুষ। তবে পরিবারতন্ত্র এবং তাঁর ডানে বামে থাকা কিছু লোকের কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছেন বলে দাবী করেন এনসিপি নেতা সায়েম সিকদার। টেন্ডবাজি ও চাঁদাবাজির কারণে অতীষ্ট হয়ে পড়া সাধারণ মানুষ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে দাবী করেন এই এনসিপি নেতা। জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা পর্যায়ের অপর এক শীর্ষ নেতা মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিএনপি নেতা-কর্মীরা এলকায় এলাকার মামলা বাণিজ্য করেছেন। যার কারণে দাঁড়িপাল্লায় ভোট বিপ্লব ঘটাতে মানুষ মুখিয়ে আছেন বলে এই নেতা মন্তব্য করেন।
এমনিতেই ১১দল সমর্থিত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলে ভোটাররা মনে করেন। ব্যাক্তিত্ব এবং জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁর যথেষ্ট ইমেইজ রয়েছে প্রান্তিক মানুষের কাছে। প্রায় ২যুগের কাছাকাছি চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি সৎ এবং অত্যন্ত ন্যায় পরায়ন ছিলেন। এ কারণেই শত ষড়যন্ত্র এবং বাঁধার মুখেও তাঁর ইউনিয়নের মানুষ টানা ৪বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। এছাড়া রাজনৈতিক সহকর্মীর পাশাপাশি আনোয়ারী টেকনাফের একটি বড় মাদরাসার প্রতিষ্ঠান প্রধান (প্রিন্সিপ্যাল) হিসেবে কাছ করেছেন অনেক বছর ধরে। দীর্ঘ বছর ধরে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে খেদমত এবং পাঠদানের কারণে উখিয়া-টেকনাফে তাঁর রয়েছে হাজার হাজার ছাত্র/ছাত্রী এবং সহকর্মী। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ তাঁকে বিজয়ী করতে মাঠে ঘাটে কাজ করছেন। তরুণ ভোটাররা মনে করেন আনোয়ারী ধানের শীষের প্রার্থীর চেয়ে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। গত সপ্তাহে ৩ ফেব্রুয়ারী আনোয়ারীর দাাঁড়িপাল্লাকে সমর্থন জানিয়ে পালংখালীর জনপ্রিয় চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী ৫শতাধিক বিএনপির নেতা-কর্মী নিয়ে জামায়াতে যোগদান করেন। সেই থেকে তিনি দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করতে উখিয়া-টেকনাফে চষে বেড়াচ্ছেন। আনোয়ারীর সাথে মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভোটারদের কাছে দুজনই ভোট ভিক্ষা চাচ্ছেন।
চলতি সপ্তাহে ৬ফেব্রুয়ারী জুমাবার দেশের অন্যতম শিল্প গ্রুপ শাহপুরী গ্রুপের কর্ণধার শিল্পপতি আনিসুর রহমান ইয়াহিয়া ও তাঁরই ভাতুষ্পুত্র সাবরাংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান আনোয়ারীকে সমর্থন জানিয়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে এলাকায় এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন এবং দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করার আহবান জানাচ্ছেন। এছাড়া শিল্পপতি ইয়াহিয়ার ভাই কাতারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্ঠা সেদেশের ইতিহাস লেখক ড. হাবিবুর রহমানও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নৈতিকভাবে আনোয়ারীকে সমর্থন জানিয়েছেন। এছাড়া স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় নেতাদের অনেকেই আনোয়ারীর দাাঁড়িপাল্লাকে সমর্থন জানিয়েছেন। সার্বিক কারণে আনোয়ারীর দাঁড়িপাল্লা এগিয়ে আছেন বরে মনে করছেন ভোটাররা। ভোটাররা বিচ্ছিনভাবে যাই বলুক ধানের শীষের প্রার্থী প্রবীণ রাজনীতিবিদ জেলা বিএনপির কর্ণধার শাহজাহান চৌধুরী ভোটের মাঠে কিন্তু একজন ফাক্কা খেলোয়াড়। শাহজাহান চৌধুরী কারিশম্যাটিক কৌশলে শেষ মুহুর্তে লড়াই হবে সমানে সমানে। ১২ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন উখিয়া-টেকনাফের মানুষ। শেষ পর্যন্ত কে হারে আর কে জিতে।
এদিকে ২উপজেলায় অর্ধ শতাধিক কেন্দ্রকে ঝুঁকিপুর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপুর্ণ কেন্দ্রে শান্তিপুর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে পুলিশ-বিজিবির পাশাপাশি অতিরিক্ত সেনা মোতায়নের দাবী জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সবকিছু ঠিকঠাঁক থাকলে আগামী ১২ফেব্রুয়অরী উখিয়া-টেকনাফের ১১৫টি ভোট কেন্দ্রের ৭৫২টি ভোটকক্ষে ৩লক্ষ ৭১হাজার ৮শ ২৫জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এদের মধ্যে ১লক্ষ ৮২হাজার ৫শ ৫১জন নারী ও ১লক্ষ ৮৯হাজার ২শ ৬৮জন পুরুষের পাশাপাশি ৬জন হিজড়াও ভোট প্রদান করবেন। এছাড়া ৩৮৬৩জন ভোটার পোষ্টাল ব্যালেটে ভোট প্রদানের জন্য নিবন্ধন করছেন বলে নির্বাচন অফিস সুত্র নিশ্চিত করেছেন।
উখিয়া রাজাপালং এলাকার জাহাঙ্গীর আলম, হাবিবুল্লাহ, আবুল কালাম ও আবুল মঞ্জুর জানান,যিনি উখিয়া-টেকনাফকে বেকার সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করতে কাজ করবেন; তাকেই তারা ভোট দিবেন। এছাড়া জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ বিনির্মাণে যিনি সকলকে নিয়ে মিলেমিশে কাজ করবেন তাঁরা তাকেই ভোট দিবেন। চাঁদাবাজ এবং দখলদারদের ”না” জানিয়ে জাহাঙ্গীর, হাবিব ও মঞ্জুর ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে জানিয়েছেন। এবারের ভোটে দখলবাজ ও চাঁদাবাজদের লাল কার্ড দেখাবেন জানিয়ে টেকনাফ পৌর এলাকার রিকসা শ্রমিক হাফেজ উল্লাহ ও ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, প্রার্থীদের মধ্যে যিনি ভাল; তাঁরা এবার তাঁকেই ভোট দিবেন। হলদিয়াপালং ইউনিয়ন এলাকার হামিদ জানান যোগ্য এবং পছন্দের প্রার্থীকে তিনি ভোট দিবেন। আগের মতো আর যাকে তাকেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেননা বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী দাঁড়িপাল্লার অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী জানিয়ে বলেন,আধুনিক উখিয়া-টেকনাফ গঠনে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ বির্নিমাণে ভোটাররা আমার পক্ষে রায় দিবেন। মানুষ পরিবর্তন চাই,দখলবাজ ও চাঁদাবাজি থেকেও বাঁচতে চাই জানিয়ে আনোয়ারী দাবী করেন দল ও মতের উর্ধ্বে উঠে মানুষ দাঁড়িপাল্লাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেবন। ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী বলেন, তিনি উখিয়া-টেকনাফের পরীক্ষিত নেতা। এখানকার মানুষ তাঁকে বহুবার এমপি বানিয়েছেন। জীবনের শেষ বারের মত জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়ে উন্নয়নমুখী কর্মকান্ডের মাধ্যমে তিনি আধুনিক উখিয়া-টেকনাফ গঠন করবেন। ইয়াহিয়া গ্রুপের কর্ণধার শিল্পপতি আনিসুর রহমান ইয়াহিয়া বলেন,উখিয়া-টেকনাফের উন্নয়নে আনোয়ারীর মতো সৎ এবং ন্যায়পরায়ন নেতা দরকার। তিনি সততা এবং ন্যায় পরায়ণতা দিয়ে উন্নয়নমূখী প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে উখিয়া-টেকনাফের চিত্র বদলে দিতে পারবেন। আনোয়ারীকে নির্বাচিত করতে পারলে উখিয়া-টেকনাফের মানুষের ভাগ্যের দুয়ার খুলে যাবে। তিনি আশা করেন, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি থেকে বাঁচতে; আগামী ৫টা বছর শান্তিতে ঘুমাতে উখিয়া-টেকনাফের মানুষ দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে ভাল মানুষ আনোয়ারীকে এমপি নির্বাচিত করবেন।
